« পূর্ববর্তী সংবাদ |
 |
¦ |
|
|
| |
বাংলাদেশে সুড়ঙ্গপথে রেললাইন যেন সুদূরপ্রসারী এক স্বপ্ন। তারপরও বর্তমান সরকারের স্বপ্ন বিলাসী নেতা এবং মন্ত্রীরা তা বাস্তবায়নের যে আশ্বাস বাণী জনগণকে শোনাচ্ছেন তা-ই বা কম কিসে। কথায় আছে "স্বপ্নে খাইলে কাঁচা মরিচ আর আলু ভর্তা কেন, পোলাও কোর্মা খাব"। যাই হোক ঢাকা শহরের বর্তমান যে নাকাল অবস্থা, তাতে উড়াল সেতু আর সুড়ঙ্গ পথে রেল যোগাযোগ ছাড়া যে কোন বিকল্প নেই দেশের বিভিন্ন সময়ের কর্তাব্যক্তিসহ বিশেষজ্ঞ মহল বহুত আগেই তা টের পেয়েছে। মিডিয়াতে এ নিয়ে অনেক লেখালেখি এবং আলোচনা হয়েছে। চারদলীয় জোট সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু'বছরেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং সময়ের পরিক্রমায় অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে উঠা হাজারও বহুতল ভবন আর স্থাপনায় ঢাকা শহর আজ পরিণত হয়েছে এক ইট-পাথরের জঙ্গলে। শহরের নাগরিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো আজ হুমকির মুখে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে। একাধারে নতুন নতুন গাড়ির প্রতিনিয়ত অভিষেক আর জাতীয়ভাবে ঢাকার উপর নির্ভরশীলতায় জীবিকার তাগিদে নিঃস্বদের রাজধানীতে আগমন মেগাশহর ঢাকাকে করে তুলেছে বসবাস অযোগ্য। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই সেটা বর্তমান সরকারও ঠিকই বুঝতে পেরেছে। আর সে জন্যই সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং এমপিরা ঢাকা শহরের জন্য উড়াল সেতুসহ পাতাল রেল নির্মাণের মহাপরিকল্পনার কথা বার বার উচ্চারণ করে সাধারণ জনগণকে আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করছেন। সরকার গত দুই বছর নতুন কিছু না দিতে পারলেও বেশ কয়েকটি মেগা উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়ে সাধারণ জনগণকে আশাবাদী করে তুলেছে। আর যদি এ সরকার কাজটি শুরু করে যেতে পারে তাহলে অন্তত সান্ত্বনা পাব এই ভেবে যে ১৫০ বছর পর হলেও আমরা আধুনিক সভ্যতার কাতারে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতে দেখছি। পৃথিবীতে এই সুড়ঙ্গ পথে রেললাইন ১৫০ বছর আগে প্রথম স্থাপন করেন আধুনিক সভ্যতার দাবিদার ব্রিটিশরা। তাও আবার লন্ডনের মতো ব্যস্ততম শহরে। শহরের উপর থেকে চাপ কমাতে মাটির নিচের ওই রেলপথের কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৬৩ সালে এবং শেষ হয়েছিল ১৮৬৭ সালে। বর্তমানে এর বিস্তৃতি প্রায় ৪শ' কিলোমিটার, যা ইউরোপ তথা বিশ্বের তৃতীয় ব্যস্ততম সুড়ঙ্গ রেলপথ। এ রেলপথে প্রতিদিন গড়ে ২০ লাখ মানুষ চলাচল করে। ব্যবহারের দিক দিয়ে প্যারিস এবং মস্কো'র সুড়ঙ্গ রেলপথের পরেই এর অবস্থান। ব্রিটিশদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তীতে বিশ্বের উন্নত দেশের বিভিন্ন শহরে এই সুড়ঙ্গ পথের রেললাইন তৈরি হয়েছে। এমনকি এ পথ নদীর তলদেশ দিয়েও তৈরি হয়েছে। জাপানে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে দু'টি দ্বীপের মধ্যে তারা সংযোগ ঘটিয়েছে। আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের ট্রাফিক জ্যাম এবং নগরের উপর চাপ কমাতে মাটির নিচে রেলপথ নির্মাণের প্রথম পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯০০ সালে। ইন্টারব্রো র্যাপিড ট্রানজিট সাবওয়ে অর আইআরটি (ওহঃবৎনড়ৎড়ঁময জধঢ়রফ ঞৎধহংরঃ ঝঁনধিু ড়ৎ ওজঞ) বা আইআরটি নামক একটি সাবওয়ে কোম্পানি ১৯০০ সালের ২৪ মার্চ কাজ শুরু করে ২৭ অক্টোবর ১৯০৪ সালে শেষ করে। আমেরিকাতে এটাই প্রথম সাবওয়ে যার দৈর্ঘ্য ছিল ৩৫ মাইল এবং তখনকার ব্যয় ছিল ৭৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার। এটা নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল ৩ বছর ৭ মাস। রাশিয়ার প্রথম সাবওয়ে 'মস্কো মেট্রো'র নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৩১ সালে যা শেষ হয় ১৯৩৫ সালের মে মাসে। এর প্রথম লাইন সোকোলনিকি (ঝড়শড়ষহরশর) থেকে অখোথনি রিয়াদ (ঙশযড়ঃহু জুধফ) পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ছিল এবং মোট স্টেশন ছিল ১৩টি। বর্তমানে এর স্টেশন সংখ্যা ১৮২টি এবং দৈর্ঘ্য ৩০১.২ কিলোমিটার। মস্কো মেট্রো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যস্ত সার্ভিস যা টোকিও'র টুইন সাবওয়ের পরেই অবস্থান। এর ১২টি লাইন আছে। প্রতিদিন এতে ভ্রমণ করে ৬.৬ মিলিয়ন যাত্রী যা ছুটির দিনে বেড়ে ৭ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সাবওয়ে প্রথম চালু হয় ১৯০০ সালের জুলাই মাসে। একটি মাত্র লাইন দিয়ে যেটা পোর্ট ভিনসেন্স থেকে পোর্ট মেলিয়ট পর্যন্ত ছিল। বর্তমানে যার বিস্তৃতি ১৬টি লাইনে। ২১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সাবওয়েতে ২৯৮টি স্টেশন আছে। ধরা হয় শহরের প্রতিটি বাসার ৫শ' গজের মধ্যেই একটি করে স্টেশন আছে। প্রতিদিন এতে ৬ মিলিয়ন যাত্রী ভ্রমণ করে যা মস্কোর পরেই অবস্থান। জাপানের টোকিওতে প্রথম সাবওয়ে'র কাজ শুরু হয় ১৯২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এবং তা শেষ হয় ১৯২৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর। উক্ত সাবওয়ের দৈর্ঘ্য ছিল ২.২ কিলোমিটার যা আসাকুজা হতে উনো পর্যন্ত সংযোগ করেছিল। বর্তমানে এর ১৩টি লাইন এবং ২৮২টি স্টেশন আছে। প্রতিদিন ৮.৭ মিলিয়ন যাত্রী চলাচল করে। এটা বিশ্বের বৃহত্তম ব্যস্ততম সাবওয়ে। মোট দৈর্ঘ্য ৩২৮.৮ কিলোমিটার।বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম নগরী হলেও এর অপর্যাপ্ত ও অপরিকল্পিত রাস্তাঘাটের কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। দিনের বেশিরভাগ সময়ে দেখা যায় মধ্য ঢাকার অধিকাংশ অংশ ট্রাফিক জ্যামের কারণে ফ্রিজ হয়ে থাকে। এতে জনসাধারণ কোন কাজ সময় মতো করতে পারে না। অপচয় হয় ব্যস্ত মানুষের কর্মঘণ্টা আর বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা তেলের। যে কোন মেগাশহরের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এলাকা জুড়ে রাস্তা থাকার কথা থাকলেও ঢাকা শহরে আছে মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ। যা নিতান্তই কম। তাছাড়া ১২ মিলিয়ন মানুষের চাপ শুধুমাত্র একমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করাও দুরূহ ব্যাপার। তাই বিজ্ঞজনেরা এ সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন সময়ে মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। কেউ বলেছেন ঢাকার চারপাশে নদী খনন করে নৌপথ চালু করতে, কেউ বলছেন ছোট ছোট গাড়ি আমদানি ও চলাচল বন্ধ করতে, কেউ বলছেন বাস রেপিড ট্রানজিট বা ট্রাম চালু করতে, কেউ আবার উড়াল সেতু এবং পাতাল রেলের কথাও বলছেন।সময়ের প্রয়োজনে ঢাকা শহরের জন্য হয়তো সকল ব্যবস্থাই দরকার, কিন্তু আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করেই কেবল সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোনটি আমাদের জন্য প্রযোজ্য। একটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে তা হলো ঢাকা শহরের চলমান যানবাহনের প্রকারভেদ। যেমন রিকশা, টেম্পো, ভ্যান, কার, মাইক্রো, বিভিন্ন সাইজের বাস/ট্রাক ইত্যাদি। বর্তমানে ঢাকা শহরের মোট ট্রাফিকের প্রায় ৫৪ শতাংশ বহন করে রিক্সা, ২৮ শতাংশ বহন করে বাস, ৭ শতাংশ বহন করে টেম্পো, অটোরিকশা আর প্রাইভেট কার বহন করে মাত্র ৯ শতাংশ। অপরদিকে রিকশা রাস্তার ৪১ শতাংশ, কার ৩৯ শতাংশ, টেম্পো/অটোরিকশা ১১ শতাংশ এবং বাস ৭ শতাংশ জায়গা দখল করে চলাচল করে। উল্লেখ্য, রিকশা ৪১ শতাংশ জায়গা দখল করলেও ৫৪ শতাংশ ট্রাফিক একাই বহন করে। এতে এটা স্পষ্ট যে ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামের মুখ্য কারণ রিকশা নয় বরং প্রাইভেট কার। যা রাস্তার ৩৯ শতাংশ এলাকা জুড়ে চলাচল করলেও মাত্র ৯ শতাংশ ট্রাফিক বহন করে। এমতাবস্থায় উড়াল সেতু নির্মাণ করা হলে কারসহ অন্যান্য মোটরযানের সুবিধা হবে, কিন্তু কোনভাবেই রিকশার উপর নির্ভরশীল ট্রাফিকের কোন উপকার হবে না। রিকশার উপর চাপ পূর্বের ন্যায় অপরিবর্তিতই থাকবে। বরং উড়াল সেতু নির্মাণের ফলে আরও প্রাইভেট কার এবং ছোট গাড়ি আমদানিতে জনগণ উৎসাহিত হবে এবং সাময়িকভাবে এ ব্যবস্থা ট্রাফিক জ্যাম কমাতে সহায়তা করলেও কয়েক বছরের মধ্যে আবার পূর্বের মতো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। অপরদিকে পাতাল রেল নির্মাণ করা হলে সকল ধরনের যাত্রী বিশেষ করে রিকশা/টেম্পো যাত্রীরাই তা বেশি ব্যবহার করবে। ফলে চাপ কমবে রিকশা এবং টেম্পোর উপর। পর্যায়ক্রমে ঢাকা শহর থেকে রিকশাও কমে যাবে বলে আশা করা যায়। তাছাড়া বিভিন্ন গবেষণা তথ্যেও এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, উড়াল সেতুর চেয়ে পাতাল রেলই ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিয়ন্ত্রণে বেশি ভূমিকা রাখবে। তবে এটা স্বীকার্য যে পাতাল রেল নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় অনেক বেশি। কিন্তু একবার নির্মাণ করতে পারলে এর ব্যবহার সামগ্রিক সুবিধা বিবেচনায় তা অনেক সাশ্রয়ী হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাই সরকারকে এ বিষয়ে অনেক ভেবে/চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, পাতাল রেল (গবঃৎড় জধরষ) নির্মাণ, নাকি উড়াল সেতু নির্মাণের। কথায় বলে না 'ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না'। আমরা আশা করবো সরকার গুরুত্ব সহকারে বিষয়টি ভাববেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।[লেখক ঃ প্রকৌশলী]