|
 |
¦ |
|
|
| |

জীবনের সর্বক্ষেত্রে আয়-ব্যয়, জমা-খরচ, লাভ-লোকসান, সাশ্রয়-অপচয় এসবের হরেকরকম সংজ্ঞা, পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ আমরা পেয়ে থাকি, করে থাকি। নিজেদের সুবিধা অনুসারে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমরা প্রায়শই পারঙ্গমতার পরিচয় এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই যে, যেন আমার জ্ঞান এবং বুদ্ধির ধারে কাছেও কেউ হাজির হতে পারবে না। একই বিষয়েই আমি প্রয়োজন অনুসারে পক্ষে যেমন যুক্তি দেখাতে পারি, তেমনি বিপক্ষেও যেতে পারি। নিজ নিজ মাইন্ডসেট এবং উদ্দেশ্যের বেড়াজালে পড়েই কিন্তু এমনটি হয়। তবে একটা কথা অস্বীকারের উপায় নেই যে, যেমন ভাবেই ব্যাখ্যা বা যুক্তি আমরা খাড়া করি না কেন প্রকৃত সত্যটা কিন্তু প্রকৃত বুঝবান ব্যক্তির বিবেচনা এড়াতে পারে না, এড়ায়ও না। তারপরও স্বার্থের তাগিদে, নিজের কর্মকে জায়েজ করার লক্ষ্যে, হয়তো বা ভবিষ্যতের জন্য আগাম 'পুঁজি' যোগানের লক্ষ্যে আমরা তখন বিবেক-বিবেচনাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও পাশ কাটিয়ে যাই, কখনো বা যেতে বাধ্য হই। তবে এ জাতীয় ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা যা করি তা অনেকটা গড্ডলিকায় করি বলা চলে। জবাবদিহিতা যেখানে যত শিথিল, সেখানে এই উদাসীনতা তত বেশি। আমি ব্যক্তিগত অজ্ঞিতায় দেখেছি যে, আমাদের দায়িত্ব পালন, কাজ করা, ভালভাবে বিচার নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করা সবকিছুই মূলত দুটা বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল; এক, বিবেকের তাড়নায় নিজ থেকে করা, দুই, না করলে আমার শাস্তির ভয় থাকা থেকে করা। সরকারি চাকরিতেও দায়-দায়িত্ব পালন_ এ দুটোর যে কোন একভাবে হতে পারে। নিজের বিবেকের তাড়না থেকে দায়িত্ববোধ উৎসারিত হলে তো কোন সমস্যাই নেই। তখন আর না করলে শাস্তির ভয় বিবেচ্যই হয় না, হতে পারে না। এ পন্থায় সম্পাদিত কাজ হয় ব্যক্তির সর্বোত্তম ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রয়োগে; এখানে নিজের আনন্দ থেকে আত্মার পরিশুদ্ধতা বড় হয়ে দেখা দেয়, কার্যশেষে নিজেকে পবিত্র এবং ফুরফুরে মনে হয়। এতে কারো খবরদারি, কারো নজরদারি, পেছনে কারো ছড়ি ঘোরানোর প্রয়োজন হয় না। এগুলো মাথায়ও আসে না, ঝর্ণাধারার মতোই আপন মনে কাজ হয়ে যায়। আর জবাবদিহিতা নিজের নিকট না হয়ে যখন ওপরওয়ালা অর্থাৎ বসের নিকট হতে হয়, তখন যাকে কাজটা না করলে যে শাস্তি পেতে হবে তার বিবেচনা। কিন্তু দেখা যায় যে, এমনতরো শাস্তির ভয়ে কিন্তু নিজের মনের তাগিদের মতো স্বতঃস্ফূর্ত কাজ হয় না, এসব ক্ষেত্রে অনেক সময়ে দায়সারা গোছের কাজ হয়ে যায়, হয়ে যেতে পারে, হয়ও। সুপারভিশন এবং মনিটরিং-এ কারো অজ্ঞতাকে সারিয়ে তোলা যায়, দুর্বল দিক উন্নত করা যায়, উদ্বুদ্ধ করা যায়। গতিশীলতাও না হয় বাড়ানো সম্ভব হয়। কিন্তু কেউ জেনেশুনে উদাসীন হলে, নজরবিহীন হলে তাকে সোজা করা কিন্তু বড়ই সুকঠিন। কঠোর শাস্তি হয়তো দেয়া যায়, কিন্তু বিবেকের তাগিদে কাজ করার পর্যায়ে তাকে নিয়ে আসা হয়ে পড়ে আরো সুকঠিন।ব্যক্তিগত জীবনেও আমরা আয়-ব্যয়, জমা-খরচ, লাভ-লোকসান কিংবা সাশ্রয়-অপচয়ে হয়তো সব সময়ে ঠিকভাবে চলতে পারি না। তারপরও নিজের রুজি-রোজগার এবং ভবিষ্যত নিয়ে আমরা কমবেশি সতর্ক থাকি, সতর্ক থাকার চেষ্টা করি। অযথা যেন অপচয় না হয়, সাশ্রয় যেন লক্ষ্য হয় তা খেয়াল রাখি। এক কক্ষ থেকে চলে এলে ও-কক্ষের বাতি নিভিয়ে দেই, পাখার সুইচ বন্ধ করি; ছেলেমেয়ের কাগজ-কলমেরও হয়তো হিসাব রাখতে চেষ্টা করি। তেমন একটা কষ্ট না হলে রিক্সা বা ট্যাক্সির পরিবর্তে হয়তো বাসেও চলি। পোশাক-পরিচ্ছদের আধিক্য পরিহার করি যাতে সাশ্রয় হয়। কিছুটা হয়তো অভ্যাসের বিষয় হয়ে পড়ে সময়ে, কিছুটা হয়তো সামাজিকতা বা মান-সম্মানের বিবেচনায়ও এসে যায় কখনো কখনো। খরচের বা ব্যয়ের অনেকগুলো বিকল্পের মধ্যে অপশন এক্সারসাইজ করার মধ্যেই অপচয় রোধ এবং সাশ্রয় বাড়ানো নির্ভর্শীল। উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যেতে পারে। আমরা যখন প্রথম স্কুলে পরীক্ষা দিতে শুরু করলাম সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়েই তখন হেড স্যার এবং হুজুর কাগজের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে তাগিদ দেয়া শুরু করলেন। মার্জিন অযথা বেশি খালি না রাখা, এক লাইন থেকে আরেক লাইনের মাঝখানে অযথা বেশি ফাঁক না রাখা, এক শব্দ থেকে আরেক শব্দের দূরত্ব মানানসই পর্যায়ে রাখা, কাগজের উভয় পৃষ্ঠে লিখা, এমনকি প্রথম পৃষ্ঠায় নাম-রোল নম্বর ইত্যাদি লেখার পর থেকেই উত্তর লেখা শুরু করা। তারপর প্রথম পাবলিক পরীক্ষা এসএসসিতে হাজির হয়ে তো পরীক্ষার খাতায় প্রথম পৃষ্ঠা থেকে উত্তর লেখার লিখিত নির্দেশই খাতার উপরেই পেয়ে গেলাম, সেই ১৯৬৭ সালের কথা। গ্রামের বাড়িতে সঞ্চয়ের লক্ষ্যে মা-চাচীদের মুষ্টিচালার স্মৃতিতো এখনো অমলিন। গন্তব্যে পেঁৗছার জন্য আমার যদি হাঁটা, বাস, রিক্সা, সিএনজি, ট্যাক্সি, নিজ গাড়ি-সবগুলো অপশন কার্যকর থেকে থাকে তখন আমি কোনটা বিবেচনায় নেব, কখন কোনটা আমার জন্য সুবিধেজনক হবে- তা কার্যকর করাই হবে অপচয় রোধ এবং সাশ্রয় বাড়ানো। অপচয় এবং সাশ্রয়-দুটো ওতপ্রোতভাবে জড়িত হলেও একটু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে বটে। আমি খেতে বসে কিছু খেলাম, কিছু না খেয়ে নষ্ট করলাম, যা আর কারো খাবার হলোনা- তা অপচয়; আর আমার এক-দু'আইটেমে যদি নিয়মমাফিক ক্যালরিসহ খাবার চলে তাহলে যদি বাড়তি একটা আইটেম একেবারে না খাই তা হলো সাশ্রয়। আবার চার টুকরা আম খেলে যদি আমার চলে পঞ্চম টুকরো না খাওয়া হচ্ছে আমার মতে সাশ্রয়। আর আট টুকরো আম নিয়ে প্রত্যেকটি অর্ধেক খেয়ে বাকি অর্ধেক এঁটো করে ফেলে দেয়া হচ্ছে অপচয়। এগুলোর আবার নিজ নিজ ব্যাখ্যা থাকতে পারে, যেমন আমি মাছ-মাংস ফেলে রাখলেতো বিড়াল কুকুর খেতে পারে, তাতে অপচয় হলো কোথায়; কেন, বিড়াল-কুকুরকে এঁটো করার আগে কি ভাল টুকরো দেয়া যায় না? কেউ হয়তো বলবেন, কৃপণ হওয়া ভাল নয়, পিঁপড়ারওতো হক আছে; কেন, সে হক কি ভালভাবে আপনার মতো করে খাইয়ে আদায় করা উত্তম নয়?সরকারি কাজে বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় অনেকে সাশ্রয়ে উদাসীন, কিন্তু অপচয়ে থাকেন নজরবিহীন অর্থাৎ একেবারে বেখেয়াল যাকে আমরা বলে থাকি। সার-সংক্ষেপ, কাগজপত্র প্রস্তুতের সময়ে কাগজের উভয়পৃষ্ঠা ব্যবহার না করা (প্রয়োজনের তাগিদে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন রাষ্ট্রীয় অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর জন্য সার-সংক্ষেপ ইত্যাদি), নোট লেখার সময়ে পূর্ণপৃষ্ঠার সদ্ব্যবহার না করা, পুরনো অতিরিক্ত কাগজ ড্রাফট বা খসড়া কাজে ব্যবহার না করা, ফেলে দেয়ার কাগজপত্র থেকে ব্যবহারযোগ্য কাগজ, জেমসক্লিপ, ট্যাগ পুনঃব্যবহারের জন্য খুলে না রাখা-ইত্যাদি হরহামেশা ঘটছে। ফলে অপচয় বাড়ছে, সাশ্রয় কমছে। আমার প্রথম পদায়ন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এমএলএসএস তোফাজ্জল থেকে আমি শিখেছি কিভাবে পোড়ানোর জন্য নির্ধারিত কাগজ থেকে ভাল কাগজ, জেমস ক্লিপ, ফাইল-কভার, ট্যাগ খুলে রাখতে হয়। তার থেকে ওটা শেখার পর আমার আর নতুন আইটেম নিতেই হয়নি। আগের খামের ওপর ইকনমি সিস্নপ ব্যবহারের কথা তো এখন ইতিহাস, নতুন প্রজন্মের নিকট হাস্যকরও বটে। দু'বার দু'টা স্টেনসিল নষ্টের জন্য তো এম কেরামত আলী (মন্ত্রিপরিষদ সচিব), স্টেনোটাইপিস্ট তাহেরকে সাময়িক বরখাস্ত করতেই যাচ্ছিলেন, সেই ১৯৮০ সালের কথা, দু'জনই এখন মরহুম। কম্পিউটার প্রযুক্তিতে এখন একপিঠে ছাপা আর অপর পিঠ খালি থাকায় অনেক সুবিধে পুনঃব্যবহারের। কিন্তু শুনতে বড় খারাপ লাগে, কৃপণ-কৃপণ, কিপটে-কিপটে, গরীব-গরীব ভাব এসে যায়, তাই না? কিন্তু আমি বলি, যা বার বার ব্যবহার করা যায়, যা একাধিক বার ব্যবহার করা যায়, যার কিছু অংশ পুনঃ ব্যবহারযোগ্য তাহলে তা করতে ক্ষতি কী। চাই শুধু একটু সতর্কতা, একটু আগ্রহ, একটু অপচয় রোধ এবং সাশ্রয়ের মানসিকতা, চাই শুধু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিকণা আর বিন্দু বিন্দু জলের কথামনে রাখা। [চলবে][সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান]