|
 |
¦ |
|
|
| |
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দেশের সরকারি মালিকানাধীন একমাত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান টেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) আজ পর্যন্ত সফল হতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের দীর্ঘ দিন পরও বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়ী ও এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা ইচ্ছে করেই টিসিবিকে সফল হতে দিচ্ছে না। কারন টিসিবি সচল থাকলে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে মত ফায়দা লুটতে পারবে না। আর টিসিবি'র ব্যর্থতায় ইচ্ছে মতো বেড়ে চলেছে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া।বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনী ইশতিহারে ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা। কিন্তু দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে টিসিবি বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারতো, কিন্তু নানা কারণেই তা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে টিসিবি অর্থ সংকটে রয়েছে বলে জানা গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে টিসিবি'র জন্য অর্থমন্ত্রণালয়ের কাছে এক হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল। এব্যাপারে কোন সাড়া দেয়নি অর্থমন্ত্রণালয়। অথচ প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বলেছেন, সব উন্নয়ন বন্ধ করে হলেও দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা হবে। তিনি আরো জানান, টিসিবিকে আড়াই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও টিসিবিকে শক্তিশালী করার বিষয়ে সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি টিসিবিকে শক্তিশালী করতে আর্থিক সহায়তা দেবার পরামর্শ দেয়। এ ব্যাপারে বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান বলেছেন, টাকার জন্য সরকার এক ধরনের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। আর স্থায়ী কমিটি অন্যভাবে সুপারিশ করেছে। টিসিবিকে শক্তিশালী করার জন্য একটি সাব কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাব কমিটি ইতিমধ্যে একটি বৈঠকও করেছে। কমিটি ঢাকায় অবস্থিত দু'টি স্থাপনা পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ দিকে টিসিবিকে সচল না করার জন্য দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটকেই দায়ী করলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহম্মদ।টিসিবিকে সচল করা প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ আনু মুহম্মদ শীর্ষ কাগজকে বলেছেন, প্রত্যেক দেশে দ্রব্যমূল্য ব্যালেন্স ও মনিটরিং করার জন্য সরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থাকে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই টিসিবিকে শক্তিশালী করার কথা বলছে। যারা ইচ্ছে মতো পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে ও ফায়দা লুটছে তাদের জন্য অসুবিধা হচ্ছে বলেই টিসিবিকে সচল হতে দিচ্ছে না। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, টিসিবি'রই অভ্যন্তরের একটি শক্তিশালী চক্র টিসিবিকে ভাঙ্গিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। গত রমজানে ২৫ হাজার মেট্রিক টন ডাল ক্রয় করার সময় মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে টিসিবি'র পরিচালক মাহফুজার রহমানের বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা শীর্ষ কাগজকে বলেন, টিসিবি'র এ চক্রটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগসাজশে নানা অপকর্ম করে যাচ্ছে। এরা এতোই শক্তিশালী যে তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাধ্য কারো নেই।জানা গেছে, মালয়েশিয়া থেকে পামওয়েল, ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে এলসির মাধ্যমে চাল আমদানি, কানাডা থেকে গম, ব্রাজিল থেকে চিনি ও সয়াবিন তেল আনার প্রক্রিয়া চলছে। আর এসব প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আগামী রমজানকে সামনে রেখে। কিন্তু কীভাবে আনা হবে সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন কিছু বলা হয়নি। যে কারণে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য তহুরা আলী বলেছেন, দীর্ঘদিন যাবৎ শুনে আসছি টিসিবিকে শক্তিশালী করা হচ্ছে, প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অথচ টিসিবিকে বাস্তবে শক্তিশালী দেখছি না।১৮ জানুয়ারি টিসিবি'র (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) অনুমোদিত মূলধনের পরিমাণ ৫ কোটি টাকার স্থলে ১ হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধি করার সুপারিশও করা হয়েছিল। গতিশীল ও শক্তিশালী করার লক্ষে টিসিবি পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় টিসিবি পুনর্গঠনের জন্য আরও ৫টি সুপারিশও করা হয়। এগুলো হলো, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে ভারসাম্য রক্ষার জন্য সার্বক্ষণিক পরিচালকের পাশাপাশি সরকার কর্তৃক ২ জন পরিচালক নিয়োগ প্রদান, একজন এফবিসিসিআই'র প্রতিনিধিসহ ৬ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ গঠন, সরকার কর্তৃক মনোনীত পরিচালক ব্যতীত অন্য পরিচালকদের দায়িত্ব সার্বক্ষণিক করা, প্রতিমাসে বোর্ড সভা অনুষ্ঠানের সময়সীমা নির্ধারণ করা এবং সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনায় প্রধান নির্বাহিকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রদানের পাশাপাশি প্রধান নির্বাহির জবাবদিহিতা নিশ্চিতকণের সুপারিশ করা হয়। বলা হয়, এর ফলে আপতকালীন সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও বাজার মূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষে আমদানি বা স্থানীয়ভাবে ক্রয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মজুদ সৃষ্টি, সংরক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহের দায়িত্ব পালন করতে টিসিবি'র জন্য সহজ হবে।জানা গেছে, ৫ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে টিসিবি যাত্রা শুরু করলেও দীর্ঘ ৩৯ বছরে সরকারের কাছ থেকে একটি টাকাও অনুদান বা ভর্তুকি নেয়নি টিসিবি। টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর রমজানে পণ্য সরবরাহে সরকার ভর্তুকি না দেয়ায় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে টিসিবিকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতি বছরের মত গত রমজানেও প্রায় ৪৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকার পণ্য আমদানি করে টিসিবি। এর মধ্যে- চিনি ক্রয় করা হয় ৮২ কেটি টাকা, ডাল ২৩০ কোটি টাকা, ছোলা সাড়ে ৮ কোটি টাকা, সয়াবিন তেল ১৩০ কোটি টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ৪টি পণ্যের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়। যার মধ্যে- প্রতি কেজি চিনি ৪৫ টাকা, ডাল ৭৮ টাকা, সয়াবিন ৭৮ টাকা এবং ছোলা ৪০ টাকা। ডাল ক্রয় করা হয় মানভেদে প্রতি কেজি ৯৩-৯৫ টাকা (নেপালী ও কানাডিয়ান), ডিলারদের মাঝে বিতরণ করা হয় প্রতি কেজি ৭৮ টাকা (মোটা দানা), সয়াবিন ক্রয় ৭৮ টাকা বিক্রয় ৭৫ টাকা, চিনি ক্রয় মানভেদে ৩৮-৪৩ টাকা এবং বিক্রয় ৪২ টাকা, ছোলা ক্রয় ৩৯-৪৩ টাকা এবং ৩৬ টাকা বিক্রয় করায় সব মিলিয়ে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। টিসিবি'র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বরাবরই টিসিবি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৯৯২-৯৩ সালে টিসিবি'র বিপুল সংখ্যক কর্মচারীকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে এক যোগে অবসরে পাঠানো হয়। ফলে অর্থ ও জনবল সঙ্কটে সংস্থাটির কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। এসব কর্মচারীকে নগদ অর্থ প্রদান করায় ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে ৯.৩৬ কোটি টাকা লোকসান হয়। এরপর থেকেই লোকসান গুনতে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠান।অন্যদিকে ১৯৯৫-৯৬ থেকে ১৯৯৯-২০০০ ৬ অর্থবছরে বিপুল সংখ্যক কর্মচারীকে অবসরে পাঠানো হয়। এসব কর্মচারীর গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের পেমেন্ট পরিশোধ করতে গিয়ে ২১.২২ কোটি টাকা লোকসানের সম্মুখীন হতে হয়েছে টিসিবিকে। এরূপ এককালীন বিপুল অর্থ প্রদানের পরও ১৯৭২-৭৩ থেকে ১৯৯৯-২০০০ পর্যন্ত ৩০ বছরে টিসিবির মোট লাভের পরিমাণ ৩১৩.৪১ কোটি টাকা। উল্লেখিত লাভ ছাড়াও আলোচ্য সময়ে মুনাফার উপর আয়কর বাবদ ১৭৩.২০ কোটি টাকা, শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য সরকারি করবাবদ ১,২০১.২২ কোটি টাকা এবং সরকারের লভ্যাংশ বাবদ ২৯.৫৫ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে প্রদান করেছে টিসিবি। দীর্ঘদিন ধরে টিসিবি একটি আমদানি ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করলেও মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু এবং পিপিআর (রেজুলেশন) ২০০৩ ও পিপিআর (রুলস) ২০০৮ প্রবর্তিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে টিসিবির আমদানি কার্যক্রম বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। উল্লেখ্য, সব ধরনের পণ্য আমদানি ও রপ্তানি সংক্রান্ত ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য ৫ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করে ট্রেডিং কপর্োরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। রাষ্ট্রপতি আদেশ নং ৬৮ (পি.ও ৬৮/১৯৭২)-র ফলে টিসিবি একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান বাজার মূল্যে টিসিবি'র প্রায় ২৫৩.৫৩ টাকার স্থাবর সম্পত্তি (জমি ও ইমারত) এবং প্রায় ৯৭.১৯ কোটি টাকার চলতি মূলধন রয়েছে।হ