|
 |
¦ |
|
|
| |
গত ২০ এপ্রিল জাতীয় ওলামা মাশায়েখ পরিষদ নামে একটি সংগঠন জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডাকে। সংবাদ সম্মেলনের বিষয় হলো, মুফতি ফজলুল হক আমিনীসহ এক শ্রেণীর আলেম সরকার প্রণীত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করছে। জাতীয় ওলামা মাশায়েখ পরিষদের অবস্থান স্বভাবতই নারীনীতির পক্ষে। নতুন এই সংগঠনটির আহ্বায়ক হচ্ছেন মাওলানা মুজিবুর রহমান যুক্তিবাদী। তার আরেক পরিচয় হচ্ছে তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সহযোগী সংগঠন জাতীয় ওলামা পার্টির সভাপতি।সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের বেশক'জন সাংবাদিক ও প্রায় ২০/২৫ জন আলেম। সকাল ১১টায় সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দুপুর ১২টা পর্যন্ত সংবাদ সম্মেলন শুরু না হওয়ায় হঠাৎ চেচামেচি শুরু করেন আয়োজক পক্ষের কয়েকজন আলেম। তাদের একজন মাওলানা আনোয়ার হোসেন। তিনি ডেমরার বায়তুন নাজাত জামে মসজিদের ইমাম। তিনি বলেন, 'আমাদের সকাল ১১টার কথা বলে এখানে আনা হয়েছে। এখন দুপুর ১২টায়ও সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়নি। আমরা কখন এখান থেকে যাবো, কখন নামাজ পড়াবো।'আয়োজকদের পক্ষ থেকে এমন কথা শুনে সাংবাদিকরা নড়েচড়ে বসেন। তারা জানতে চান, আপনারা কারা? কে আপনাদের এনেছে। পরে জানা গেল উপস্থিত আলেমরা হচ্ছেন ঢাকার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম। এরা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের শিক্ষক।জানা গেছে, গণশিক্ষা প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা বেতনের কাগজে স্বাক্ষর দেয়ার কথা বলে সকাল ১০টায় এসব ইমামদের বায়তুল মোকাররম আসতে বলেন। বায়তুল মোকাররম আসার পর তাদের বলা হয় জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে যেতে। কিন্তু তারা কিছুই জানেন না ওই অনুষ্ঠান সম্পর্কে। প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ইমামরা ব্যানারে দেখতে পান নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ পক্ষে সংবাদ সম্মেলন। এক পর্যায়ে ইমামদের একজন বলেন, সরকার যে নারীনীতি তৈরি করেছে, তা ভাল না খারাপ- তা আমরা জানি না। আমাদের নারীনীতির কপি দেয়া হোক। কিন্তু আয়োজকদের কাছে নারীনীতির কোন কপি না থাকায় তা তারা সরবরাহ করতে পারেননি। এ সময় ইমামরা হৈচৈ করেন। এভাবেই দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইমামদের দিয়ে এখন অহরহ সরকার সমর্থিত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর সভা-সমাবেশ হচ্ছে। আজ ইসলামিক ফ্রন্ট, কাল বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট, পরশু আওয়ামী ওলামা লীগ, তরুণ জাতীয় ওলামা মাশায়েখ পরিষদের কর্মী হয়ে মিছিল-সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে ইমামদের। শুনতে হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মো. আফজালের ফরমায়েশও। কারণ, এসব ইমাম ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক। সারা দেশের ৩৮ হাজার ইমাম এ প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন মাত্র ১৮শ' টাকা । জানা গেছে, চাকরি রক্ষার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের নির্দেশে নিজ খরচে এসব ইমামদের মাসে একাধিক সভা-সমাবেশে যোগ দিতে হয়। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক এ সব ইমাম এখন বিভিন্ন ব্যক্তির উচ্চাভিলাষের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান চৌধুরী, ইসলামিক ফ্রন্টের খন্দকার গোলাম মাওলা নকশবন্দী, আওয়ামী ওলামা লীগের মাওলানা ইসমাইল এবং সাম্প্রতিক সময়ে মাওলানা মুজিবুর রহমান যুক্তিবাদী- এদের সভা-সমাবেশে মানুষ যোগান দেয়ার একমাত্র ভরসা মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের এ সব ইমামরা। কথায় কথায় সভা-সমাবেশ ডেকে সরকারের শীর্ষ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন সরকার সমর্থক এসব সংগঠনের নেতারা।ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মো. আফজাল গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক এ সব ইমামদের মধ্য থেকে ৪টি সমিতি করে প্রচার করেন, দেশের সব ওলামা মাশায়েখ এখন চার সমিতির মাধ্যমে সরকারের পক্ষে। প্রধানমন্ত্রীকে এনে তিন বার ঘোষণা দেন, এখন চার সমিতির মাধ্যমে দেশে একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলেছি। অথচ নারীনীতি নিয়ে মুফতি আমিনীর বিগত হরতালে এদের কাউকে মাঠে পাওয়া যায়নি। ইফা'র বোর্ড অব গভর্নরস-এ সদস্য হিসেবে আছেন সাইনবোর্ড সর্বস্ব কতিপয় ইসলামিক দলের নেতা। এসব দলের নিজস্ব কোন কর্মী নেই। তাই কর্মী হিসেবে হাজির করা হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক ও মসজিদের ইমামদের। দেশের সবক'টি জেলায় এদের কমিটি গঠন ও সম্পন্ন করা হয় কর্মরত গণশিক্ষার মধ্য থেকে এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালকদের মাধ্যমে। অনুষ্ঠানের সব খরচপাতিও বহন করা হয় গণশিক্ষা প্রকল্প থেকে। এত কিছুর পরও এসব রাজনৈতিক দল সরকারের জন্য নিয়ামক ভূমিকা রাখতে পারছে না।সাম্প্রতিক সময়ে নারীনীতি নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকায় সরকারের পক্ষে মিছিল-মিটিং করতে নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ এবং গাজীপুর থেকে ইমামদের হাজির করা হয়। এর আগেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেয়া হয়। এসব অনুষ্ঠানে দর্শক হিসেবে হাজির করা হয় এ সব ইমামদের। এ সব সভা-সমাবেশে আসার জন্য ইমামদের কোন যাতায়াত ভাতা দেয়া হয় না। এমন কি খাওয়ার জন্য এক বোতল পানির পয়সাও দেয়া হয় না। কেবল বলা হয়, চাকরি বাঁচাতে হলে আসতে হবে। সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইমামদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক পণ্য হিসেবে ব্যবহার বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম নয়। - নিজস্ব প্রতিবেদক