ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ মে ২০১১. ২০ বৈশাখ ১৪১৮, ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩২

¦

দেশে ৫০টিরও বেশি উপজাতি নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করছে। এই সব জাতিগোষ্ঠী নানা সময়, নানান ভাবে তাদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছে। কিন্তু তাদের সম্পর্কে ভুল তথ্য প্রকাশের কারণে এই উপজাতিদের পরিচয় বিকৃত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণীর ভুলে ভরা পরিবেশ পরিচিতি সমাজ বইয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম । এতে গোটা দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও ভুল শিক্ষা গ্রহণ করে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এনসিটিবির প্রকাশিত বই লেখার জন্য লেখকদের পর্যাপ্ত সময় না দেয়া, অভিজ্ঞ লেখকদের বই লেখতে না দেয়া, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা, উপজাতিদের সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিদের দিয়ে বই লেখানো, এমনকি তথ্য সঠিক ভাবে যাচাই না করায় এসব ভুল হয়েছে বলে জানা গেছে। ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ফর ইনক্লুসিভ পিপল্স নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চিত্র তুলে ধরে। ভুল ও অসংগতিপূর্ণ চিত্রের কথা স্বীকার করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান মস্তোফা কামাল উদ্দিন শীর্ষ কাগজকে বলেন, আগের পাঠ্য বইতে অনেক ভুল ছিলো। বর্তমানে অনেক কমেছে। অতি দ্রুত আরো সংশোধনের পদক্ষেপ নেয়া হবে। অভিজ্ঞ উপজাতি লেখক দিয়ে এসব প্রবন্ধ সংশোধন করা হবে।প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রী আফসারুল আমীন শীর্ষ কাগজকে বলেন, পাঠ্যপুস্তকে উপজাতি সম্পর্কে যে সমস্ত ভুল ও অসংগতিপূর্ণ চিত্র রয়েছে, ২০১১ সালের মধ্যে তা সংশোধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভবিষ্যতে যাতে এরকম ভুল আর না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার শীর্ষ কাগজকে বলেন, এদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে কাজ চলছে। পাঠ্য পুস্তকে যে সমস্ত ভুল রয়েছে তা সংশোধনের প্রক্রিয়া ২০০৯ সাল থেকেই শুরু হয়েছে। এখনো সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।উপজাতিদের সংজ্ঞা ও পরিচয় ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণীর সমাজ বইয়ে উপজাতিদের নাম পরিচয় ভুল ছাপানো হয়েছে । পাশাপাশি যে স্থানে কোনো উপজাতির বসবাস নেই বইয়ে সেসব স্থানে তাদের বসবাসের কথা বলা হয়েছে। অপরপক্ষে অনেক স্থায়ী উপজাতিদের কথা বইয়ে আনা হয়নি। ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ফর ইনক্লুসিভ পিপল্স এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চতুর্থ শ্রেণীতে পাঠ্য 'পরিবেশ ও পরিচিতি' পুস্তকের ৮৪ পৃষ্ঠায় ছাপা ছকে দেশের সুপরিচিত উপজাতি ত্রিপুরা এবং রাখাইন গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করা হয়নি।একই পৃষ্ঠায় চাকমাদের সম্পর্কে পাঠ্য বইয়ে বলা হয়েছে "রাঙ্গামাটি জেলা এবং খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়ে অধিকাংশ চাকমাদের বাস। চাকমাদের আদিনিবাস মায়ানমারের আরাকান অঞ্চলে"। বইয়ে উল্লেখিত চাকমাদের আদিনিবাস মায়ানমারের আরাকান অঞ্চলে তথ্যটি ভুল। চাকমাদের আদিনিবাস হিমালয়ের পাদদেশে চম্পক নগর বলে ইতিহাসে বর্ণিত আছে।একই বইয়ের ৮৫ পৃষ্ঠায় (চিত্র.১১.১) চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক শিরোনামে চাকমা পোশাক পরিহিত যে চিত্র দেখানো হয়েছে তা চাকমা জনগোষ্ঠীর ছবি নয়। আঞ্চলিক উপজাতিদের অবস্থান পাঠ্য বইয়ে এক অঞ্চলের উপজাতিকে অন্য অঞ্চলের উপজাতি বলে দেখানো হয়েছে । পরিবেশ পরিচিতি সমাজ বইয়ের ৯৪ পৃষ্ঠায় মারমা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বর্ণনায় লেখা হয়েছে, "বান্দরবান জেলায় অধিকাংশ মারমা বাস করে। এছাড়া কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায়, মারমা বাস করে।" এ তথ্য সঠিক নয়। কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় যারা বাস করেন তারা রাখাইন। রাখাইন হলো একটি পৃথক জনজাতি। শুধু তাই নয়, ৫ম শ্রেণীর সমাজ বইয়ে ১৪৬ পৃ. বান্দরবানের এলাকায় মুরংরা বসবাস লেখা হয়েছে প্রকৃতপক্ষে মুরং নামের কোন গোষ্ঠী নেই । এরা মারমা ।সাঁওতাল সম্পর্কিত ভুল তথ্যসাঁওতালদের বাসস্থান, পোশাক, খাবার ও নৃত্য সম্পর্কে ভুল তথ্য ও অসংগতিপূর্ণ চিত্র দেয়া হয়েছে পাঠ্য বইয়ে। বইয়ের ৮৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, সাঁওতালদের ঘরগুলো ছোট ছোট এবং মাটির তৈরি । ঘরে সাধারণত কোন জানালা থাকে না। এ তথ্য ভুল। প্রকৃত তথ্য হচ্ছে এদের ঘরগুলোতে আলো বাতাস প্রবেশের জন্য জানাল আছে। একই পৃষ্ঠায় লেখা আছে "সাঁওতাল মেয়েরা শাড়ি দুই টুকরো করে পরে"। এই তথ্যও সম্পূর্ণ বিকৃত এবং ভুল। মূলতঃ সাঁওতাল মেয়েরা তাদের ঐতিহ্যময় পোশাক পরিধান করে থাকেন। মেয়েদের পোশাকের উপরের অংশের নাম পাঞ্চি, নিচের অংশের নাম পারহাটি । বইয়ের ৯১(১১.৫ চিত্র) পৃষ্ঠায় সাঁওতাল রমণীদের নৃত্য বিষয়ক চিত্র সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর প্রতিচ্ছবি নয়। বলা যায় এটা কাল্পনিক চিত্র। বাস্তবে এরকম নয়।গারো জনগোষ্ঠীর পরিচয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ৫ম শ্রেণী পাঠ্য বইতে গারো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বর্ণিত তথ্যাদির অধিকাংশই ভুল। বইয়ের ১৪০পৃ. (চিত্র ৪৮) গারো মহিলার যে চিত্র দেয়া হয়েছিল, তা গারো মহিলার নয়। প্রবন্ধে বলা হয়েছে "গারো মেয়েরা বস্নাউজ ও লুঙ্গি জাতীয় পোশাক পরে"। এমন তথ্য সম্পূর্ণ ভুল। তাদের ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব পোশাক রয়েছে। যা তাদের পরিচয় বহন করে। মূলত গারো মেয়েরা যে পোশাক পরিধান করে থাকেন সেটা ভিন্ন। তাদের বক্ষবন্ধনীর নাম আনফেং, নিচের পরিধেয় বস্ত্রকে বলা হয় দক বান্দা কিংবা দক শাড়ি। ১৪১ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে গারোদের প্রিয় খাবার খরগোশের মাংস। অথচ গারোদের প্রিয় খাবার ভাত, মাছ, মাংস, সবজি।১৪২ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে, গারোগণ মৃত্যুর পর মৃতদেহ খাটিয়ায় রাখে,রাতে মৃতদেহ পোড়ায় এবং আপন জনের মৃত্যুতে তারা শোকের নাচ-গান করে এমন বর্ণনা সঠিক নয়। মৃত্যু কারো জন্যই আনন্দের হয়না। তাই এদিন তারা বিলাপ করে শোক প্রকাশ করে। কোন নাচ গান করে না। খাসিয়াদের পরিচয় খাসিয়াদের বাসস্থান, পোশাক সম্পর্কে ভুল তথ্য ছাপানো হয়েছে। বইয়ের ১৪২পৃষ্ঠায় খাসিয়া উপজাতি সম্পর্কে যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাতেও যথেষ্ট ভুল তথ্য রয়েছে। মূলত: খাসিয়ারা লোকালয় থেকে দূরে অরণ্যের ছায়ায় গ্রামে বসবাস করে। খাসিয়া পুঞ্জিতে তারা এক জাতীয় লতানো পান চাষ করে। পুস্তকের ১৪৩ পৃষ্ঠায় (চিত্র ৪৯) খাসিয়া মহিলা ও পুরুষের নমুনা হিসাবে যে ছবি ছাপানো হয়েছে, আসলে তা খাসিয়াদের নয়। খাসিয়া মেয়েরা লুঙ্গি ও বস্নাউজ পরে এ তথ্য সম্পূর্ণ ভুল। খাসিয়া মেয়েদের পোশাকের নাম ডেকিয়াং (ওপরের অংশ), ডেহিম (নিচের অংশ), পুরুষরা ধূতি ও শার্ট পরে থাকে। বর্তমানে তারা আধুনিক পোশাকও পরিধান করে। মণিপুরীদের ভাষা ও ধর্ম৫ম শ্রেণীতে সমাজ পুস্তকের ১৪৩-১৪৪ পৃষ্ঠায় মণিপুরী জনগোষ্ঠী সম্পর্কে পরিচিতিমূলক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে- "মণিপুরীদের নিজস্ব কোন ধর্ম নেই। অধিকাংশ হিন্দুদের বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী। অল্প কিছু মণিপুরী ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী"। পাঠ্যসূচিতে ছাপা এমন বর্ণনা অত্যন্ত আপত্তিজনক এবং বিকৃত।গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মণিপুরীদের নিজস্ব ভাষা আছে। এই ভাষাকে মণিপুরী ভাষা বলা হয়। মৈথেয়ী ভাষা নয়। মণিপুরীদের একটি অংশ বিষ্ণুপ্রিয়াদের ভাষার নাম বিষ্ণম্ঠার। এছাড়া মণিপুরীদের নিজস্ব ধর্ম আছে, আদি ধর্মের নাম আ পোক পা। মণিপুরীদের আরেক অংশ, মৈ তৈরা আ পোক পা ধর্মে বিশ্বাসী। তবে বর্তমানে তারা সনাতন ধর্মের অনুসারী। মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়ারা সনাতন ধর্মের বৈষ্ণবপন্থি। মণিপুরীদের একটি অংশ মৈ তৈ পাঙন নামে পরিচিত। মৈ তৈ পাঙনরা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক গবেষক,বিশ্লেষক ও ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ফর ইনক্লুসিভ পিপল (দীপ) নির্বাহি পরিচালক চৌধুরী আতাউর রহমান রানা শীর্ষ কাগজকে বলেন, উপজাতীয়দের আবাসভূমি চিহ্নিত করতে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে কাল্পনিকভাবে কুকি, পামে উপজাতির/ আদিবাসীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমন ধরনের নামে কোন নৃ-গোষ্ঠীর অস্তিত্ব এদেশে নেই। মগ, টিপরা, মুরং উল্লেখ করে আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীর নাম বিকৃত করা হয়েছে।হ



বিশেষ প্রতিবেদন - এর আরো খবর
ডিসিসি'র কচুরিপানা পরিষ্কারের নামে অর্থ লোপাট
টিসিবি কি সচল হবে?
ওরিয়নের আরেক দুর্নীতির নজির
অতিরিক্ত জেলা জজ পদে ১৩ বিচারকের পদোন্নতি কার্যকর হচ্ছে না যে কারণে
সরকার দলীয় ক্যাডার ও অসাধু কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্যে পিছিয়ে যাচ্ছে সরকারের উন্নয়ন কাজ
তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে নতুন ফর্মুলায় বিতর্ক তুঙ্গে
গৃহায়নের ২৯ প্লট দখলের ঘটনা তদন্তের নির্দেশ : কমিটি গঠন
পদ্মা সেতুর ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের নামে যা হচ্ছে হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
হঠাৎ মুক্তিযোদ্ধাকে এবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ!
রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে ইমামদের ব্যবহার
দু'টি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে রহস্য!
হৃদরোগ হাসপাতালে কর্মচারী নেতাদের দাপট
অবশেষে সচিবালয়ের আলোচিত সুবেদার রাজারবাগে
৫ ইস্যুতে বিপাকে মহাজোট সরকার
পুলিশ পরিদর্শক ওমর ফারুকের দুর্নীতি অনুসন্ধানে দুদক
সম্ভাবনাময় গ্যাস ক্ষেত্র চলে যেতে পারে বিদেশি কোম্পানির হাতে
ভূমি মতিয়রের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
হোম ¦ শীর্ষ প্রতিবেদন ¦ কড়চা ¦ অপ্রিয় বচন ¦ বিশেষ প্রতিবেদন ¦ সদর-অন্দর ¦ ন্যায়-অন্যায় ¦ মুক্ত মঞ্চ ¦ কাছে দূরে ¦ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ¦ খেলাধুলা ¦ আন্তর্জাতিক ¦ প্রবাস ¦ সুন্দর জীবনের জন্য ¦ রদবদল ¦ জানা-অজানা ¦ সম্পাদকীয়
2011 © Copyright to SheershaNews.Powered By : orangebd