« পূর্ববর্তী সংবাদ |
 |
¦ |
|
|
| |

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী কাজ করবে, দেশের মানুষ সেটা কোনভাবেই প্রত্যাশা করে না। অথচ এই অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলোই ঘটছে। মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে যা হচ্ছে- তাতে সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি কি না, সেটাই অনেককে নতুন করে ভাববার অবকাশ দিয়েছে। কারণ, শুধু অমুক্তিযোদ্ধাই নন, এমনকি রাজাকারকেও মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেয়া হয়েছে এই সরকারের আমলে। যা হতাশ করেছে সচেতন মানুষকে।এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মুক্তিযুদ্ধ এদেশের মানুষের কাছে একটি অত্যন্ত আবেগের জায়গা। সেই সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিও রয়েছে আমাদের অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধ। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে অমুক্তিযোদ্ধাদেরকে অর্থের বিনিময়ে সনদ প্রদান করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরকেই অসম্মান করা হচ্ছে। সেই সাথে এই সনদকে একটি চক্র চাকরি ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে নতুন এক দুর্নীতির জন্ম দিয়েছে। যার কারণে ভবিষ্যতে মামলা হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে। আর এর সাথে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-এর নাম জড়িয়ে পড়ায়, এ নিয়ে ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রীকেও যে জবাবদিহি করতে হবে না, তার কোন নিশ্চয়তা আছে কি?আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্বের একচ্ছত্র দাবিদার। এখন তাদের আমলেই যদি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারাও মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট পেতে সমর্থ হয়, অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রে কী হবে? ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে অন্য দলগুলো যদি এভাবে নির্বিচারে সবাইকে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দিতে থাকে, আওয়ামী লীগের কিছু বলার থাকবে কী? সেক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় সত্তা, ইতিহাস এ সবই কী হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে না? মিথ্যের আড়ালে কি ঢাকা পড়ে যাবে না মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ-এর সোনালী ইতিহাস? অন্য যেসব দল মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্বের জন্য এমন দাবিদার নয়, তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু খোদ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ে যদি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে এরকম একটি আঘাত আসে, সেটা আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশার এবং বেদনার।শীর্ষ কাগজ বেশ কিছুদিন ধরেই মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নিয়ে জালিয়াতি হচ্ছে, এই সব তথ্য সম্বলিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছিল। বিশেষ করে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সংখ্যায় 'মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রীর মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দুর্নীতি' শিরোনামে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বহু তথ্য এবং ডকুমেন্ট স্ক্যান করে প্রকাশ করে প্রমাণ দেয়া হয়_ মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রীর সহায়তায় কী করে সার্টিফিকেট দুর্নীতি হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রমাণ দেয়া হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই দেয়া হয়েছে মুক্তিযোদ্ধার সনদ। এ পর্যন্ত প্রকাশিত কোন তালিকা, চারটি গেজেট, এমনকি মুক্তিবার্তায়ও নেই, এমন অনেকের নামেই সার্টিফিকেট ইস্যু হচ্ছে। এছাড়া ভুয়া তথ্যও দিয়েছেন অনেকে। তারপরও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নিজেই সরাসরি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাধ্য করছেন এসব সনদপত্র ইস্যুতে। সেই সুযোগে সনদপত্র বাগিয়ে নিয়েছেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা, এমনকি রাজাকাররাও। অবশ্য এজন্য মোটা অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে।এতদিনে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স বাড়ানোর আদেশ জারির পর এই সুবিধা গ্রহণ করতেই মূলত ভুয়া সার্টিফিকেটের এই বাণিজ্য শুরু হয় এই সরকারের আমলে। যাদের মধ্যে আছেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শাহাবউদ্দিন, পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আব্দুস সোবহান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব সুনিল কান্তি বোস-এর মত শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এরা প্রায় সবাই চাকরি জীবনে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আর এরকম রাঘব বোয়ালদের প্রতিমন্ত্রী স্বয়ং সাহায্য করেছেন বলে শীর্ষ কাগজের ওই প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিবের মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটটি যে ভুয়া তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তিনি এলপিআর-এ যাওয়ার আগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য আবেদন করেছিলেন। তিনি যদি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে থাকেন, তাহলে তো তার এমনিতেই আরও ২ বছর চাকরিতে বহাল থাকার কথা। তিনি কেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য আবেদন করবেন? আসলে তিনি তখনও নিশ্চিত হতে পারেননি মুক্তিযোদ্ধার যে ভুয়া সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেছেন তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবেন কি না। আর এজন্যেই এই আবেদন করেছিলেন। অবশ্য পরবর্তীতে একটি মহল তাকে নিশ্চিত করেন চাকরিতে এভাবেই বহাল রাখার ব্যাপারে। আর এ ভাবেই সরকারের একটি অংশ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছেন। যদিও এক পর্যায়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব-এর বিপক্ষে পদক্ষেপ নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে তার কাগজপত্র চেয়ে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কোন এক অদৃশ্য কারণে সে প্রক্রিয়াও থেমে যায়। আর আমাদেরও বুঝে উঠতে কষ্ট হয় না, সচিবের বিরুদ্ধে আসলে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে না। শেষ পর্যন্ত অমুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষাবলম্বন২২ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সংখ্যায় শীর্ষ কাগজে প্রকাশিত প্রচ্ছদ প্রতিবেদনটি সেই সময় সচেতন পাঠকমহলে বিশেষ আলোড়ন তুলেছিল। এরপর এই বিষয়গুলো নিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে তদন্ত পরিচালিত হয়। জেনেছি, তদন্তে শীর্ষ কাগজের প্রতিবেদনের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। এরপরই গত বছরের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সংস্থাপন সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করতে চারটি মানদ- নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এ মানদ-ে যারা উত্তীর্ণ হবেন তারাই কেবল দু'বছর চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন। দেখা গেছে, ইতিমধ্যে দু'বছর চাকরির বর্ধিত মেয়াদের সুবিধা নিয়েছেন এমন ১৬৩ জন চারটি শর্তের একটিও পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এরা সবাই বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) মাধ্যমে সনদ নিয়েছিলেন। মূলত এ নির্দেশনা জারির পরই ভুয়া সনদধারীদের বর্ধিত চাকরির মেয়াদ অবৈধ হয়ে যায়। তাদের চাকরিচ্যুতির আশংকা দেখা দেয়। এরপরই তারা এ নির্দেশনা ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেন। তারা ভুয়া সনদ নিতে যেমন বিপুল অর্থ ঢেলেছেন সেভাবে এ সনদ টিকিয়ে রাখতে মাঠে নামেন। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা বিশাল অংকের অর্থও এর জন্য ব্যয় করেন তারা। আর এভাবে ম্যানেজ করে ফেলেন প্রতিমন্ত্রীকেও। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা সম্বলিত চিঠির কারণে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এ দোহাই তুলে এ নির্দেশনা পুনর্বিবেচনার আবেদন জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। এজন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একটি সার-সংক্ষেপ পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। অবশেষে তারা সফলও হন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো সর্বশেষ চিঠি তাদের পক্ষেই যায়। নতুন চিঠিতে পূর্বের চারটি শর্ত বহাল রেখে সাথে আরো নতুন একটি শর্ত যোগ করা হয়েছে। আর এই নতুন শর্তটিই চাকরিচ্যুতি থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে এই ১৬৩ জন কর্মকর্তাকে। যা অত্যন্ত হতাশ করেছে সচেতন সমাজকে। একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করতে সরকারের প্রথম চিঠির ৪টি মানদ-ই যথেষ্ট বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেছিল। সরকার এ মানদ-ের বিষয়টি সামনে এনে তাদের সদিচ্ছার পরিচয় দিয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাতে অটল থাকতে পারেনি। দ্বিতীয় চিঠির শেষ শর্তটি ইতিমধ্যে ভুয়া সনদ নেয়াদের শুধু বাঁচিয়েই দেয়নি, চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির সুবিধার অপব্যবহারের নতুন দুয়ারও খুলে দিয়েছে। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্তের পরিণতি ভবিষ্যতে কী হতে পারে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষক মহলের মধ্যে বেশ সংশয় দেখা গেছে। কারণ, বিশেষত এই ১৬৩ জন কর্মকর্তার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট যে ভুয়া তা নিয়ে এখন আর কারোই সংশয় নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রীর অবৈধ হস্তক্ষেপে এরা রিটায়ারমেন্টের পরও চাকরিতে বহাল আছেন। এর পরে অন্য দল ক্ষমতায় এসে এ বিষয়টি নিয়ে তদন্তে করলে এই সরকারের ফেঁসে যাওয়ার সমূহ আশংকা আছে। তাই সরকারের নিজের স্বার্থেই উচিত হবে- এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া। কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের জন্য সরকার কেন নিজের বিপদ ডেকে আনবে। বিশেষ করে এই আমলের সব কিছুর দায়ভার তো শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকেই বহন করতে হবে।জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলবলা হচ্ছে যে, মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ দেয়ার ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়-এর যে সব নীতিমালা রয়েছে সেগুলো থেকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচানোর জন্যই নাকি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। যে কারণে একে ভুয়াদের মুক্তিযোদ্ধা বানাবার কাউন্সিল হিসেবে বলতেও শোনা গেছে। এর কারণও আছে। এর আগে শীর্ষ কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে যে, মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর নাম সরকারি গেজেট, মুক্তিবার্তা এবং ই বি আর সি (ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কোর) এ তিনটি তালিকার যে কোন একটিতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। এ সংক্রান্ত দাখিল করা দলিলাদি যাচাই-বাছাইয়ের পর মন্ত্রণালয়কে সনদপত্র সরবরাহ করতে হয়। এ তিনটি তালিকায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কারো নাম নাও থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাদের সনদপত্র দেয়ার জন্য ভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করা হয়।মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করে আরো তিনটি তালিকা রয়েছে- এরশাদের আমলে তৈরি জাতীয় তালিকা, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের তালিকা (যা ভারতীয় তালিকা নামে পরিচিতি) ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচনে ব্যবহৃত ভোটার সূচক তালিকা। যাদের পূর্বের তিনটি তালিকার একটিতেও নাম নেই তাদের সনদপত্র পাওয়ার জন্য এ তিনটি তালিকার যে কোন দু'টিতে নাম অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। এছাড়াও ইতিমধ্যে যারা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেয়েছেন এ সংক্রান্ত প্রমাণপত্রের ভিত্তিতে তাদেরও সনদপত্র ইস্যু করতে পারে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। উপরের ছয়টি তালিকায় কারো নাম না থাকলে তারাও মুক্তিযোদ্ধা সনদ পেতে পারেন। এক্ষেত্রে একটি নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। এ নীতিমালা অনুসারে একেবারে উপজেলা পর্যায় থেকে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে যাচাই-বাছাই হয়ে শেষে মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গঠিত কাউন্সিল সনদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এজন্য প্রথমেই মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে গড়া উপজেলা শনাক্তকরণ কমিটি আবেদন যাচাই করে। এ কমিটি মতামত দিয়ে পাঠায় জেলা পর্যায়ে। সেখানে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি উপজেলা থেকে পাঠানো মতামত পরীক্ষা করে। পরবর্তীতে এ কমিটি তাদের সুপারিশ পাঠায় মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের কাছে। তারা যাচাই-বাছাই করে পাঠায় মন্ত্রণালয়ে। এ পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত কাউন্সিল সেই সব মতামত বিবেচনা করে আবেদনকারীকে সনদ দেয়া যায় কিনা তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে। ছয়টি তালিকার বাইরে কেউ মুক্তিযোদ্ধার সনদের জন্য আবেদন করলে মন্ত্রণালয়ের একক সিদ্ধান্তে তা দেয়ার বিধান নেই। এমনকি বিভিন্ন আঞ্চলিক মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বা সংসদের কোন কর্মকর্তা কর্তৃক প্রত্যয়ন পত্র দেয়া হলেও তার ভিত্তিতে সনদপত্র প্রদানের কোন নিয়ম নেই। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। বরং মূলত উপরে উল্লেখিত এই সব তালিকায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শাহাবউদ্দিন, পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আব্দুস সোবহান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব সুনিল কান্তি বোস-এর মত শীর্ষ পর্যায়ের রাঘব বোয়াল কর্মকর্তাদের নাম না থাকার কারণেই জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল গঠন করা হয়। যার মাধ্যমে এই অমুক্তিযোদ্ধারা হয়ে যান মুক্তিযোদ্ধা। রাজাকার পুনর্বাসনশুধু প্রতিমন্ত্রী একাই যে অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন তা নয়। এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই আওয়ামী লীগের কিছু নেতা, সংসদ সদস্য, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতারাও। বর্তমান আওয়ামী লীগসহ মহাজোট সরকার যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা নিয়ে জোর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন- তখন রাজাকার, জামায়াত-শিবির, আলবদর ও স্বাধীনতা বিরোধী সমর্থিত কর্মকর্তাদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ পাইয়ে দিতে আওয়ামী লীগের কিছু নেতা, সংসদ সদস্য, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতা উঠেপড়ে লেগেছেন। তাদের তদ্বিরের কারণে মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা পর্যন্ত বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের পক্ষ থেকে যাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের একটি অন্যতম অংশ জামায়াত-শিবির, আলবদর, জঙ্গি ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্র সমর্থিত কর্মকর্তা বলে যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা প্রমাণ পেয়েছে। রাজাকার, জামায়াত-শিবির, আলবদর, জঙ্গি ও স্বাধীনতা বিরোধী সমর্থিত কর্মকর্তাদের মুক্তিযোদ্ধা বানানোর তদ্বির বাবদ লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। বিপুল অংকের উৎকোচের বিনিময়ে একশ্রেণীর আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতা এই কাজে মাঠে নেমেছেন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেকেই এই তদ্বিরকারীদের চাপের মুখে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ঠাঁই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগও উঠেছিল।অনেকে সন্দেহ করছেন, একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী চক্র আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর ক্ষমতাধর নেতা, সংসদ সদস্য, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকে লাখ লাখ টাকা দিয়ে হাত করে নিয়েছে। এরপর এ নেতাদের মাধ্যমে নব্য মুক্তিযোদ্ধার সনদ সংগ্রহ করে অথবা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সাজিয়ে বর্তমান সরকারের আমলে ভাল জায়গায় বদলি নিয়ে নিরাপদে চাকরি করবে এবং নীরবে সরকার বিরোধী কার্যকলাপ চালিয়ে যাবে। অন্যদিকে মোটা অংকের উৎকোচ পেয়ে একশ্রেণীর আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ দলের আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে এ ধরনের কাজ করে দিতে দ্বিধা বোধ করছে না। এরা দলের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে না। তাই সরকারের উচিত সময় থাকতে এ সব আদর্শহীন, অর্থ লোভী নেতা ও সংসদ সদস্যদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। নইলে এরা ভবিষ্যতে সরকারের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে বলে মনে করেন অনেকেই।কেন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না?ইতিমধ্যে এমন অনেক ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট প্রদর্শন করে এই কোটায় চাকরি নিয়েছেন। কিন্তু প্রমাণিত হওয়ার পরও এই অপরাধের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।বরগুনা সরকারি কলেজের গ্রন্থাগারিক মো. ইউনুস মিয়া হচ্ছেন এমন একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তার এই জাল সনদ দিয়েই ছেলে ইলিয়াস কবির মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২৫-তম বিসিএস-এ এএসপি পদে ও অপর ছেলে মো. ফেরদৌস ২৬-তম বিসিএস-এ প্রভাষক পদে চাকরি পান। এজন্য অবশ্য তিনি মোটা অঙ্কের অর্থও ঢেলেছেন বলে জানা গেছে। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় খবর এবং অভিযোগ উঠলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় তার বিষয়ে তদন্ত করে। তদন্তে ইউনুস মিয়ার মুক্তিযোদ্ধা সনদ ভুয়া প্রমাণিত হয়। গেজেটের মাধ্যমে বাতিল করা হয় ইউনুস মিয়ার দু'টি সনদই। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ভুয়া সনদের ভিত্তিতে চাকরি নেয়ার বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। তারপরও কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। এখন কথা হল, এভাবে যদি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট গ্রহণ করে সুবিধাপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নেয়া না হয়, তাহলে এই সরকার কী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথেই অন্যায় করছেন না?অভিযোগ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দিকেসরকার মুক্তিযোদ্ধা চাকরিজীবীদের চাকরির মেয়াদ দু'বছর বৃদ্ধি করার পর পরই মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র নেয়ার হিড়িক পড়ে যায়। সরকারি চাকরিজীবীদের অসংখ্য আবেদনপত্র পড়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। বেশির ভাগেরই দেয়া তথ্য ভুয়া এবং নীতিমালা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র পাবার যোগ্য নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এরা অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশে সনদপত্র পেয়েছেন। প্রতিমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ প্রভাবে যারা অবৈধভাবে সনদপত্র নিয়েছেন এদের মধ্যে আছেন অতি সমপ্রতি অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তাও। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শাহাবউদ্দিন, ৪৩/ও-২ ইন্দিরা রোডের (স্থায়ী ঠিকানা সয়াধানঘড়া, সিরাজগঞ্জ), জাহিদুর রহমান খান, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. আবদুস সোবহান মিঞা (গোলাপ), কাস্টমস কমিশনার মো. শাহ আলম খান, সাব-রেজিস্ট্রার মো. মোশাররফ আলী, কাজী মোহাম্মদ আলী আনোয়ার যার বর্তমান ঠিকানা গুলশানের ৩৫/এ নং সড়কের ৩৭ নম্বরবাড়ি (স্থায়ী ঠিকানা-ইলিয়টগঞ্জ, দাউদকান্দি, কুমিল্লা), মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ইতিপূর্বের সচিব (বর্তমানে ওএসডি) মো. ফিরোজ কিবরিয়া, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক আবুল কালাম মোহা. আজাদ প্রমুখ ব্যক্তিরা সবাই প্রতিমন্ত্রীর সহায়তায় ভুয়া মুক্তিযুদ্ধ সনদের অধিকারী হয়েছেন। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১০ প্রকাশিত সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজের ৪০ তম সংখ্যার 'মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রীর মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দুর্নীতি' শিরোনামের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনটিতে এ নিয়ে বিস্তারিত আছে। যার সত্যতা এখন প্রমাণিত। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেননি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার কেন মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটের এই বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না তা আমাদের বিস্মিত করছে।মুক্তিযোদ্ধা কোটা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করতে এবং তাদের প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমাদের দেশে মুক্তিযোদ্ধার কোটার প্রচলন ঘটেছে। বর্তমান সরকার এই সুবিধা আরও কিছুটা বৃদ্ধি করে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স সীমা বাড়িয়ে দিয়েছেন আরও ২ বছর। এছাড়া ৩০ শতাংশ কোটা পূরণ হয় না বলে, প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনীরাও কোটা পাবেন। এ সবের মাধ্যমে যোগ্যদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে কি না সেটা হয়ত আলাদা হিসাব। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কৃতিত্বের দাবিদার আওয়ামী লীগ সরকার কী এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পেরেছে যে তাদের বৃদ্ধি করা সুবিধাগুলো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাই পাচ্ছেন? কারণ, যেভাবে এই সরকারের আমলেও মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট কেনাবেচা চলছে- তা এখন পর্যন্ত বন্ধ করা যায়নি। যে কারণে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে এখনো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় সর্বত্রই কোণঠাসা।এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, প্রায় প্রতিটি সরকারের আমলেই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা নিয়ে হয়েছে নোংরা রাজনীতি। প্রতিটি সরকারের আমলেই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা 'সংশোধন' হয়েছে। আর সে সুযোগে দলীয় লোকজন ছাড়াও অনেকেই অর্থের বিনিময়ে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ফলশ্রুতিতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা হয়েছেন অবহেলিত। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলেও চলবে এরই ধারাবাহিকতা, এটা কেউই আশা করে না। এই সরকারের আমলেও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা মূলত মিথ্যা তথ্য ও মোটা অঙ্কের অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র নেবেন, চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধা আদায় করে নেবেন_ এটা মেনে নেয়া কঠিন। অথচ এখনো তাই ঘটে চলছে। যেমন পত্রিকায় এমন খবরও দেখা গেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের নামে টাকার বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ও পরিচয়পত্র প্রদান করে নিরীহ লোকদের বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন শিবগঞ্জের আব্দুল লতিফ মন্ডল নামের এক ব্যক্তি। তিনি নাকি ২৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন সমিতি গঠন করেন। প্রত্যেক সদস্যের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা করে নিয়ে একটি মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ও পরিচয় পত্র প্রদান করেন।এটি তো একটি উদাহরণ মাত্র। সারাদেশে এরকম আছে আরও অনেকে। যেখানে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে কাজ করছেন, সেখানে অন্যরা পিছিয়ে থাকবেনই বা কেন? কিন্তু এই সরকারের আমলেও যদি এভাবে মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেটের কেনাবেচা চলে, আর এর জন্য দায়ী ব্যক্তিরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তা কি এই সরকারের জনসমর্থন ধরে রাখার পক্ষে খুব একটা উপযোগী হবে?হ